চীনের পথে হঠাৎ পা: গুয়াংজু ভ্রমণের খুঁটিনাটি

২০১৮ সালের আগস্ট। হুট করেই চীনের গুয়াংজু ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিলাম আমি ও আমার দুই বন্ধু। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স তখন স্কাই স্টার গ্রাহকদের জন্য দারুণ এক চায়না ভিসা ও টিকিট অফার দিচ্ছিল। আমরা সুযোগটা হাতছাড়া করিনি। ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে রওনা হয়ে পৌঁছলাম গুয়াংজুর বাইয়ুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। পা রাখতেই চীনা ভাষার প্রথম যে দুটি শব্দ শিখলাম—"WC" (ওয়াশরুম) ও "নি হাও" (কেমন আছেন)—তা আজও মনে গেঁথে আছে।
গুয়াংজু শহর: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন দক্ষিণ চীনের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র গুয়াংজু একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী, অন্যদিকে আধুনিকতায় পরিপূর্ণ। ইলেকট্রনিকস, গার্মেন্টস, গাড়ি নির্মাণ, টেক্সটাইলসহ অসংখ্য শিল্প-কারখানা এখানে গড়ে উঠেছে, যেগুলো শুধু চীনের নয়, সারা বিশ্বেই পণ্য সরবরাহ করে। খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই—হালাল খাবারের জন্য রয়েছে চাইনিজ মুসলিম, ইরানি, পাকিস্তানি, ইয়েমেনি, তুর্কি ও বাংলা রেস্টুরেন্ট। চাইনিজ গুজ রোস্ট, বিফ খোরমা, বিরিয়ানি, ক্যান্টোনিজ সামুদ্রিক মাছ সবই হাতের নাগালে। শপিংয়ের স্বর্গ: শাংজিয়াজিউ ও দামি মল গুয়াংজু শপিং পছন্দকারীদের জন্য এক স্বর্গ। ফ্যাশনেবল পোশাক থেকে শুরু করে কসমেটিক্স, রিফারবিশড মোবাইল, পাওয়ার ব্যাংক, গেমিং ডিভাইস—সবই এখানে পাওয়া যায় অবিশ্বাস্য দামে। বাংলাদেশে প্রচলিত বহু ব্র্যান্ডের উৎপত্তি এখান থেকেই! ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ঝলক ১. বাওমো গার্ডেন কিং রাজবংশের আমলে নির্মিত এই বাগানটি ছিল অপূর্ব প্রশান্তির আধার। বিশাল প্রবেশদ্বার, ফুলের বাগান, জলাশয় আর সাঁতরাতে থাকা মাছ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তবে ফিরে আসার সময় ট্যাক্সি পেতে কিছুটা সমস্যায় পড়ি। ২. ক্যান্টন টাওয়ার গুয়াংজুর হৃদয়ে অবস্থিত ক্যান্টন টাওয়ার এবং তার আশপাশের এলাকা যেন এক জীবন্ত আনন্দভুবন। সুউচ্চ এই টাওয়ার কেবল শহরের প্রতীকই নয়, আধুনিক স্থাপত্য ও বিনোদনের এক বিস্ময়কর সম্মিলন। এর চারপাশে ছড়িয়ে আছে সুপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, সাজানো গাছপালা, এবং অত্যাধুনিক মেট্রো রেললাইন, যা গোটা পরিবেশকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়। বিকেল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা অবধি এখানে মানুষের ঢল নামে—কেউ আসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, কেউবা প্রিয়জনের সঙ্গে নিরিবিলি সময় কাটাতে। ক্যান্টন টাওয়ারকে পেছনে রেখে ছবি তোলা যেন এখানে আসা প্রতিটি দর্শনার্থীর আবশ্যিক কাজের তালিকায় পড়ে। আলোকসজ্জায় টাওয়ারটি যখন ঝলমল করে ওঠে, তখন চারপাশ যেন রূপকথার কোনো জগতে রূপ নেয়। ৩. চিমেলং সাফারি পার্ক এই পার্কে সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল পান্ডা ট্রিপলেটদের দেখা। ছোট্ট ট্রেনে পার্কের ভেতরে ভ্রমণ করে দেখলাম তাদের বাঁশের ভিলা, ফল-সাজানো কেকের জন্মদিন উদযাপন। যেন এক শান্তিপূর্ণ, আনন্দঘন অভিজ্ঞতা। ৪. দাফো টেম্পেল গুয়াংজুর অন্যতম প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির—দাফো টেম্পেল। তিনটি বিশাল ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি এবং মন্দিরের ধূপ-সুগন্ধি পরিবেশ আমার আত্মা প্রশান্তিতে ভরে দিয়েছিল। ৫. স্যাক্রেড হার্ট ক্যাথেড্রাল দাফো টেম্পেল থেকে মাত্র ২ কিমি দূরে এই ক্যাথেড্রাল। সম্পূর্ণ গ্রানাইট পাথরে নির্মিত গথিক স্থাপত্যের নিদর্শন। রঙিন কাচের জানালায় আলো পড়ার দৃশ্য ছিল সত্যিই অপূর্ব। ৬. হুয়াচিং স্কয়ার সবুজের সমারোহ আর আধুনিক ভবনের মেলবন্ধনে গড়া এই স্কয়ার থেকে ক্যান্টন টাওয়ারের দৃশ্য ছিল দারুণ মনকাড়া। সন্ধ্যায় আলো-আঁধারিতে দৃশ্যপট হয়ে ওঠে আরও মোহনীয়। ৭. শ্যাংশিয়া পেডেস্ট্রিয়ান স্ট্রিট এই পথ যেন গুয়াংজুর হৃদস্পন্দন! নানা রকম দোকান, ফুড স্টল, রঙিন বাতি ও মানুষের কোলাহলে জমজমাট এক জীবন্ত রাস্তা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল প্রাণের ছোঁয়া। গুয়াংজুতে কেনাকাটার অভিজ্ঞতা আমরা ইলেকট্রনিক্স মার্কেট থেকে মোবাইল সেট, পাওয়ার ব্যাংক, ভিডিও গেম ডিভাইস সংগ্রহ করি। লরিয়ালসহ নানা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কসমেটিক্সও পাওয়া গেল সস্তায়। এখানকার কাপড় এতটাই উন্নতমানের ছিল যে নিজের দেশের তুলনায় হতাশ হতে হলো। জুতার ডিজাইন, মোটর পার্টস, এমনকি ছাতা পর্যন্ত এখানে তৈরি হয়ে বাংলাদেশে রপ্তানি হচ্ছে! আর চকলেট—সে তো চেখে না দেখলে বোঝা যাবে না কতটা সুস্বাদু ও সাশ্রয়ী। শেষকথা: গুয়াংজু ভ্রমণ শুধু কেনাকাটা বা দর্শনীয় স্থান দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না—এটি ছিল এক সংস্কৃতি, ইতিহাস, প্রযুক্তি আর সৌন্দর্যের মেলবন্ধন। আকস্মিকভাবে শুরু হওয়া এই সফর আমাদের জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছিল। Thanks & Regards =================== Hassan Mahfuz LinkedIn:https://www.linkedin.com/in/hasanclymax Email: hasanclymax@gmail.com

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

হাসান মাহফুজ: কুয়ালালামপুরে একটি যাত্রা - বন্ধুত্ব, রোমাঞ্চ এবং আবিষ্কার।

An Unplanned Step into China: The Details of a Guangzhou Journey