বুম বুম রঙিন থাইল্যান্ড
২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস। হঠাৎ একদিন ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ থেকে বন্ধু রাজীব ফোন করলো—থাইল্যান্ড ভ্রমণের পরিকল্পনা করছে, আমাকে ভিসা করার কথা বলল। তখন আমি সিলেটে অবস্থান করছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার আগের নেপাল ভ্রমণের তিন সাথী—রিপন, রোপন ও ইমাম—এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল।
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে, আমরা নিজ উদ্যোগে সিলেট ভিএফএস সেন্টারে পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে এলাম। শুরু হলো অপেক্ষার পালা। কিছুদিন পর থাই দূতাবাস থেকে আমার মোবাইলে ফোন আসে। তারা আমার নাম, ঠিকানা এবং ব্যবসার ধরণ সম্পর্কে জানতে চায়। এরপর তারা সরাসরি জানতে চায়—আপনার কি থাইল্যান্ডে ব্যবসা করার ইচ্ছা আছে? আমি সরলভাবে উত্তর দিলাম—“আমার ব্যবসার সঙ্গে থাইল্যান্ডে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি শুধুই ঘুরতে যাচ্ছি, কারণ ঘুরে বেড়ানো আমার শখ।
এক সপ্তাহের মধ্যে এসএমএস পেলাম—আমার পাসপোর্ট প্রস্তুত। ভিএফএস সেন্টার থেকে সংগ্রহ করে দেখি, পাসপোর্টে থাই ভিসা লাগানো।
এবার শুরু হলো বন্ধুদের ভিসার গল্প:
প্রথম বন্ধু: তাকে শুধু ফোনে সাধারণ কিছু তথ্য জিজ্ঞেস করে সরাসরি ভিসা দিয়ে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় বন্ধু: একইভাবে তথ্য নিয়ে ভিসা দেওয়া হলেও পাসপোর্টে ‘VOID’ সিল দেওয়া হয়। আমাদের ধারণা, তার ব্যাংকে বড় অঙ্কের টাকা থাকায় দূতাবাস হয়তো সন্দেহ করেছে, তাই নাটকীয়ভাবে ভিসা বাতিল করে।
তৃতীয় বন্ধু: তাকে সরাসরি ঢাকায় থাই দূতাবাসে ইন্টারভিউর জন্য ডাকা হয়। প্রশ্ন করা হয়: “আপনি যেহেতু সার্ভিসে আছেন, তাহলে রড-সিমেন্টের দোকানে আপনার দায়িত্ব কী?” তিনি জবাব দেন: আমি মার্কেটিং ম্যানেজার। আমাদের কাজ হলো পণ্যের মার্কেটিং করা এবং বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন সাইটে ভিজিট করা। আমি মনে করি সে প্রশ্নের উত্তর ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারে নি! দুর্ভাগ্যজনক হলেও, তাকে ভিসা দেওয়া হয়নি।
বন্ধুদের এমন অভিজ্ঞতা দেখে আমি কিছুটা দোটানায় পড়ে যাই—যাবো কি যাবো না? রাজীব নিজেও স্পষ্ট কিছু বললো না, তবে আচরণ দেখে বুঝতে বাকি রইল না—তারও ভিসা হয়নি ।এমন সময় একদিন হঠাৎ মেঘ না চাইতে বৃষ্টি হয়ে দেখা হয়ে গেল আমার আরেক পুরোনো বন্ধু সাকি-র সাথে। কথা বলতে বলতে সে জানালো—থাইল্যান্ডের ভিসার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করতে পারব কি না। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে, পরের দিনই প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্টস জোগাড় করে এজেন্টের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠিয়ে দিলাম। মাত্র ৭ দিনের মাথায় পাসপোর্টে থাই ভিসা এসে গেল! থাইল্যান্ডে বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা পাওয়া যেমন অতটা সহজ নয়, তেমনি অতটা কঠিনও নয়। নিয়ম মেনে কাগজপত্র ঠিক রেখে সত্য তথ্যের ভিত্তিতে আবেদন করলে ভিসা পাওয়া সহজ হয়ে যায়। টুরিস্ট ভিসা আবেদন করতে মোট খরচ পরবে ৩৭৪০ টাকা এবং ভিসা পেতে প্রায় ১৫-২0 দিন পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। যেদিন ভিসার জন্য আবেদন করা হবে ওইদিন থেকে হিসাব করে মোট তিনমাসের জন্য সিঙ্গেল এন্ট্রি টুরিস্ট ভিসা দেওয়া হয় যার প্রথম দিনগুলো পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যায়।
এবার টিকেট কনফার্ম করার পালা। আমার এক বড় ভাই ট্যুরিজম নিয়ে কাজ করেন, তিনি অনুপমা ইন্টারন্যাশনাল-এর মাধ্যমে রিজেন্ট এয়ারলাইন্সে টিকেট বুক করে দিলেন। তার অনুরোধে একজন, আরেক বন্ধুর অনুরোধে আরেকজন—এইভাবে আমরা হয়ে গেলাম মোট ৫ জন, যদিও ট্রাভেল ব্যয়ের দিক থেকে ৪ জন থাকলেই বেশি সুবিধাজনক হতো।
শেষপর্যন্ত, টিকেট কনফার্ম হলো—২১ এপ্রিল ২০১৫, ২০ এপ্রিল আমি আর সাকি সিলেট থেকে ফ্লাইটে ঢাকা আসলাম , রিপন এবং রুপন অলরেডি টাকায় অবস্থান করছিলো তাদের হোটেলে চলে আসলাম । ভোরে যখন হোটেল থেকে বের হবো রুপনের মন খারাপ হয়ে গেলো আমরা অবশ্যই অরে কিছু বলার ভাষা রইলো না । বাকীরা যে যার মতো করে বিমানবন্দরে চলে আসলো । ঢাকা → ব্যাংকক রুটে। চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টে ৩০ মিনিট বিরতির পর প্রায় ৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের যাত্রা শেষে আমরা পৌঁছালাম সুসজ্জিত সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যে কারো দেখে মন জুড়িয়ে যাবে । এবার ইমিগ্রেশন সহযে হয়ে গেলো হুটেল বুকিং করি নাই, নিজেরা দেখে পছন্দ সই হুটেল নিবো। সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে বের হতেই সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমি আর রিপন সিদ্ধান্ত নিলাম, আগে পাতায়া যাওয়ার বাসের টিকিট কেটে নেই। প্রতিজন ২০০ বাথ করে পাঁচটি টিকিট কাটা হলো। তখনও বাস ছাড়তে এক ঘণ্টা ত্রিশ মিনিট বাকি। এই সময়টুকু আমরা ঘোরাঘুরি আর গল্পে কাটিয়ে দিলাম। ঠিক সময়ে বাসে উঠলাম। প্রায় তিন ঘণ্টার মনোরম যাত্রা শেষে আমরা পাতায়ায় পৌঁছালাম। এরপর স্থানীয় টুকটুক (অটো রিকশা) ভাড়া করলাম—প্রতি জন ১০০ বাথ করে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে, তাই এবার হোটেল খোঁজার পালা। সবাই বেশ ক্লান্ত। ২-৩টি হোটেল ঘুরে বুঝলাম, নন-সিজন চলায় রুম ভাড়া তুলনামূলক কম। আমরা ৩ বেডের একটি রুম নিলাম ৯০০ বাথে, আর ২ বেডের আরেকটি রুম নিলাম ৮০০ বাথে। হোটেলের নাম AA Pattaya—৫ তারকা হোটেল এই বাজেটে পাওয়া অবিশ্বাস্য। ফ্রেশ হয়ে সবাই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম।
রাত ৮ টার পর আমরা বের হলাম খাবারের খোঁজে। KFC থেকে খেয়ে রওনা হলাম বিখ্যাত Walking Street-এর দিকে। রাতে এই এলাকা যেন নতুন প্রাণে জেগে ওঠে। থাই ও রাশিয়ান সুন্দরীরা নাচে-গানে পর্যটকদের মাতিয়ে রেখেছে। আমরা তিন বন্ধু একটি শো-রুমে প্রবেশ টিকিট কেটে প্রাপ্তবয়স্ক শো দেখতে গেলাম। যা দেখলাম তা সত্যিই ভয়ংকর ছিল—এক মেয়ের পারফরম্যান্স এখনও মনে হলে মাথা ঘুরে যায়। দর্শকদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো—বিশ্বের নানা দেশের পর্যটক, এমনকি একটি আরব পরিবার পর্যন্ত ছোট শিশু নিয়ে শো দেখতে এসেছিল! শো শেষে বাইরে বেরিয়ে বিনামূল্যে কিছু সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপভোগ করলাম। বুঝলাম, পাতায়ার রাত্রি মানেই বিনোদন, আলো, আর উদ্দামতা—এখানে রাত ঘুমায় না। লাইভ মিউজিক, ড্যান্স শো, ম্যাজিক শো সবকিছু মিলিয়ে রঙিন এক জগত। রাত গভীর হতেই হোটেলে ফিরে শান্তির ঘুমে ডুবে গেলাম। পরদিন দুপুরে ঘুম থেকে উঠে গেলাম কাছের এক রেস্টুরেন্টে। Egg Fried Rice অর্ডার করলাম, রান্না হলো চোখের সামনে। খাওয়ার পর দেখি, একই কড়াইয়ে অন্যদের জন্য হালাল নয় এমন কিছু রান্না হচ্ছে। তখনই বুঝলাম—এখানে খাবার খাওয়ার আগে হালাল-হারামের বিষয়ে সচেতন থাকা খুব জরুরি। বিচ রোডে ঘুরে ঘুরে দেখলাম—হালাল বা বাংলা খাবার তখন খুব একটা ছিল না। প্রচণ্ড গরমে দুপুরে রাস্তাঘাট ফাঁকা, পর্যটকেরা সাধারণত বিকেল ৪টার পর বের হয়। তাই আমাদের খাবারের নির্ভরতা তখন 7/Eleven দোকান থেকে রেডিমেড Egg Fried Rice বা Seafood Fried Rice-এর উপর। বিকেলে বিচ রোডে হাঁটতে বের হলাম। ‘বুম বুম’ দেখার সময়। বিশ্বের সব দেশের ললনারা যেন পাতায়ায় এসে জড়ো হয়েছে। বলকান অঞ্চল, ইরান, ইউরোপ, আফ্রিকা, এমনকি বাংলাদেশি ও ভারতীয়াও পিছিয়ে নেই। তবে লেডি বয় নিয়ে সতর্কতা জরুরি—চেনা সহজ নয়, তাই মনে সন্দেহ হলে সরাসরি জিজ্ঞেস করাই ভালো। পরে গেলাম Sanctuary of Truth—সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিস্ময়কর টেম্পল, যা পুরোপুরি কাঠ দিয়ে তৈরি। এর অসাধারণ কারুকাজ ও নকশা যে কাউকে অভিভূত করবে। সন্ধ্যায় গেলাম Pattaya Viewpoint ও Mimosa নামক ছোট একটি থাই সাংস্কৃতিক ভিলেজে। পুরো জায়গাটা রঙিন আলোকসজ্জায় সাজানো। সেখানে থাই ট্র্যাডিশনাল শো চলে, প্রবেশ ফি না থাকলেও শো দেখলে টিকিট কাটতে হয়। রাতে আবার ফিরে এলাম Walking Street-এ, আর রাত কাটালাম রঙিন আলো ও সুরের মাঝে।
Coral Island ভ্রমণ
পরদিন সকালে রওনা দিলাম Coral Island (কোরাল আইল্যান্ড) যাওয়ার জন্য। Walking Street-এর শেষ প্রান্তে রয়েছে ফেরিঘাট। সকাল ৮টায় ঘাটে পৌঁছালাম—চারপাশ নিস্তব্ধ, যেখানে কিছু ঘণ্টা আগেই ছিল কোলাহল আর আলোয় ভরা রাত। ৩০ বাথ করে টিকিট কেটে ফেরিতে উঠলাম। জীবনে প্রথমবারের মতো সাগরের বুকে ভেসে চলার অভিজ্ঞতা সত্যিই দারুণ ছিল। প্রায় ৪০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছালাম কোরাল আইল্যান্ডে। বিচে একটি খাট ভাড়া নিলাম। এমন সময় হঠাৎ এক ট্যুরিস্টের পায়ে ক্যাটফিশ নামক বিষাক্ত একটি মাছ বিঁধে দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই একজন বোতল দিয়ে পায়ে আঘাত করে বিষ বের করার চেষ্টা করেন। আমি সাঁতার জানি না এবং ওই ঘটনার প্রভাবে সমুদ্রে নামলাম না। তবে বাকিরা আনন্দে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফিরে এসে টেপের পানি দিয়ে নিজেদের পরিষ্কার করল সবাই।
শেষ বিকেলের ঘোরাঘুরি ও বিদায়
বিকেলে রওনা হলাম Silver Lake-এর দিকে। বিশাল এলাকাজুড়ে আঙুরের বাগান ও নানা রঙের ফুলে ভরা দৃশ্য মনকে ছুঁয়ে গেল। প্রবেশ ফি নেই, তবে গাড়িতে করে পুরো এলাকা ঘুরতে ১৮০ বাথ ভাড়া দিতে হয়। সন্ধ্যার আগে ফিরে এলাম বিচ রোডে। হেঁটে হেঁটে কিছু ‘বুম বুম’ দেখলাম— পাতায়া ভ্রমণের শেষ সন্ধ্যা।
কারণ, পরদিন সকালে ব্যাংককের উদ্দেশ্যে পাতায়া ছাড়ার সময়। এখন পাতায়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য হালাল ও বাংলা রেস্টুরেন্ট, কিন্তু ২০১৫ সালের দিকপ এইসব কল্পনাতেও ছিল না। তখন রাতের খাবারের জন্য 7/Eleven দোকানই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। এমন নয় যে আমরা বাংলা খাবার পাই নাই। পেয়েছি যেখান থেকে কুরাল আইল্যান্ড এর ফেরির টিকেট কিনেছি তার পাশে এই রেষ্টুরেন্ট, রুচির জন্য খেতে পারি নাই।আমাদের দেশের সালাদিয়া হোটেল গুলার মত ! একজন বাংলাদেশিকে পাওয়া গেলো এই দোকানে তার কাছ থেকে জানলাম পাতায়াতে ১৫ থেকে ২০ জন বাংলাদেশি আছেন । বাকরাি সবাই টেইলারিং দোকানে কাজ করেন। খাবার কিনে হোটেলে ফিরে এলাম। মাথায় অসংখ্য স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা—একটি আনন্দময়, রোমাঞ্চকর এবং একটু একটু বিস্ময়ভরা পাতায়া ভ্রমণ শেষ হলো এভাবেই। সকালে সবাই যখন গোছগাছ নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই রিপন একটুখানি ঝামেলা করলো। সে জানালো, তাকে আরও এক ঘণ্টা সময় লাগবে—কারণ আগের দিন সে একটি স্যুটের সেট অর্ডার করেছিল। একজন বাংলাদেশি সিলেটি টেইলার দোকানদার পাতায়া, যাই হোক, আমরা আগেভাগেই স্যুটের দোকানে চলে গেলাম। দোকানটি সময়মতো এবং সুন্দরভাবে ডেলিভারি দিতে সক্ষম হলো। সেই সঙ্গে তিনি আমাদের সহযোগিতা করলেন এবং কফি নাস্তা খাওয়ালেন এবং একটি টুকটুকের ব্যবস্থা করে দিলেন।
আমরা বাস কাউন্টারে পৌঁছে গেলাম এবং এক ঘণ্টার মধ্যেই ব্যাংককের বাসে উঠে পড়লাম। প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যে আমরা ব্যাংককে পৌঁছে গেলাম। আমাদের গন্তব্য ছিল সুকুমভিট সই নানার দিকে। বাস কাউন্টারের কাছাকাছি এমআরটি স্টেশন ছিল। আমরা টিকিট কেটে কয়েকটি স্টেশন এগোলাম। তখন এমআরটি লাইনের কিছু অংশে কাজ চলছিল। স্টেশন থেকে নেমে আবার একটি টুকটুকে করে সই নানাতে পৌঁছালাম। এবার হোটেল খোঁজার কথা উঠলো, কিন্তু কেউই রাজি হলো না—সবার আগে দরকার খাবার! সই নানায় প্রচুর দেশি রেস্তোরাঁ রয়েছে। মনে হলো অনেক দিন পর এত মজা করে খাচ্ছি—দেশি মাছ, গরুর মাংস, ভর্তা—সবই পাওয়া যায় এখানে। এখানে প্রচুর বাংলাদেশি বসবাস করে। এশিয়ার মধ্যে অন্যতম একটি বিখ্যাত মেডিকেল প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এই সই নানায়। খাবার শেষে হোটেল খোঁজা শুরু করলাম। কাছেই পাওয়া গেল সুমনা'স হোটেল, যার মালিক একজন চাইনিজ বৃদ্ধা মহিলা। তার স্বভাব একটু খিটখিটে। সেখানে তিন বেডের একটি রুম ১২০০ বাথ এবং দুই বেডের একটি রুম ৮০০ বাথে পাওয়া গেল। রাতে বের হলাম সই নানার সৌন্দর্য উপভোগ করতে। রাস্তার চারপাশে ফুটপাতে হকারদের মেলা বসেছে—বাচ্চাদের খেলনা, প্রাপ্তবয়স্কদের এক্সেসরিজ, বিভিন্ন ধরনের স্যান্ডেল ও প্রপ্তবয়স্কদের মেডিসিনও বিক্রি হচ্ছে। লোকাল লোকদের সাথেও কথা হলো একটা দোকানদার মেয়েকে পাওয়া গেলো থাই মনে হলো না । জানতে চাইলাম সে উত্তর দিলে সে বর্মাইয়া তাদের নিজস্ব কোন দেশ নাই । বিষয়টা মনে গেতে গেলো কারন আমাদের দেশে অনেক রোহিঙ্গা রয়েছে । জানতে চাইলাম মুসলিম না কি সে জানালো সে হিন্দু । তার কাছ থেকে চকলেট নিলাম । একটু এগোতেই মনে হলো যেন পাতায়ার বিচ রোডে এসে পড়েছি। পৃথিবীর নানা প্রান্তের তরুণীরা এখানে জড়ো হয়েছে। ইরানি, মরক্কো ও তুরস্কের মেয়েদের কদর এখানে একটু বেশি। কাছেই একটি ইরানি বার রয়েছে, যেখানে এক বোতল মদের দাম লাখ টাকার ওপরে—এই প্রথম শুনলাম!
বয়সে প্রৌঢ় আরবি ও নন-আরবি অনেক পর্যটক এখানে আসেন। হয়তো একাকীত্ব কাটাতে। তাদের এক বা একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে দেখা যায়। তবে দুঃখজনকভাবে, কোনো তরুণ যুবককে আমি এধরনের কার্যকলাপে জড়িত হতে দেখিনি। আগামীকাল আমাদের দল থেকে দুইজন ফিরে যাবে নিজ নিজ গন্তব্যে। বিদায়ের আগে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কেনাকাটায়। কারো মাথায় ঘুরছে গ্র্যান্ড প্যালেস, কারো সাফারি ওয়ার্ল্ড, আবার কারো ভাসমান বাজার (Floating Market) ঘুরে দেখার ইচ্ছে। তবে শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো—এবার শুধু শপিং, শুধু আগামীকাল ভাসমান মার্কেটে যাওয়া হবে। সকালে একটি ট্যাক্সি রিজার্ভ করলাম ৪০০ বাথ দিয়ে, আমাদের দুই ভাইকে বিদায় জানিয়ে হোটেল থেকে রওনা দিলাম। তাদের একজন বিদায়ের আগে সকালের নাস্তার ট্রিট দিলেন, সে আমার পূর্বপরিচিত ছিলো মুহূর্তটি একটু আবেগময় হয়ে উঠল। বিদায় শেষে আমরা চলে এলাম এমবিকে মার্কেট। সবাই শপিংয়ে মগ্ন—কেউ জামা-কাপড়, কেউ ঘড়ি, কেউ উপহার সামগ্রী কিনছে। সেখান থেকে রওনা দিলাম সুখুমভিট এলাকায়। এবার গন্তব্য সই নানা-তে অবস্থিত সুপার মার্কেট। শপিংয়ের ধুম লেগে গেলো, যেন একে অন্যকে হার মানানোর প্রতিযোগিতা।
এক অচেনা মুখ, এক ছোট্ট পরিচয়-
বিকেলের দিকে হোটেলের সামনেই পরিচয় হলো এক খ্রিস্টান তরুণীর সঙ্গে, এসেছে ইথিওপিয়া থেকে। সে জানালো, তাদের দল চারজনের। সে আমাকে প্রশ্ন করল—আমি কি ইথিওপিয়া থেকে এসেছি? আমার গায়ের রঙ তাদের মতো হওয়ায় সে এমনটা ভেবেছিল। আমি হেসে বললাম, না, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।
সে পাশে থাকা একটি অ্যাপার্টমেন্টের দিক দেখিয়ে বলল, সেখানে দুজন হিজাব পরা মহিলা রয়েছে, যাদের দেখে তার নিজের দেশের কথা মনে পড়ে গেছে। আমি জানালাম, হ্যাঁ, তারা মুসলিম, এবং আমি নিজেও একজন মুসলিম—আলহামদুলিল্লাহ। এরপর সে নিজের একটি দুঃখের গল্প শোনাল—তার ইতালিয়ান বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেছে, মন খারাপের কারণে সে এখানে এসেছে কিছুটা সময় কাটাতে। আমার কাছে জানতে চাইল—এই পুরো এলাকা আমি চিনি কিনা। আমি বললাম, মোটামুটি অভিজ্ঞতা আছে। তখন আমি তাকে নিয়ে সই নানা এলাকায় ঘুরিয়ে দেখালাম।
একসাথে হাঁটা, আবার এক বিদায়
শপিং এখনও শেষ হয়নি, তাই আমি আবার সবার সঙ্গে মিলিত হলাম। কাছাকাছি একটি শপিং মলে ঢুকে কিছু কেনাকাটা করলাম—বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য খেলনা। সন্ধ্যার দিকে হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম, আবার দেখা হয়ে গেল সেই ইথিওপিয়ান মেয়েটির সঙ্গে। জানাল সে একটি প্রাইভেট ফার্মে অ্যাকাউন্টস বিভাগে কাজ করে। এবার সে সই নানা এলাকা আরও একটু ঘুরে দেখতে চাইল। আমি তাকে নিয়ে গেলাম, হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম ইরানি বার এলাকায়।
সে জানাল, এই ধরণের জায়গা তার পছন্দ নয়—শুধু বিশেষ উপলক্ষ্যে সে এমন জায়গায় যায়। ফেরার পথে হঠাৎ করে সে হোঁচট খেল এবং তার পায়ের পাতায় বেশ কেটে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই ওষুধ ও প্লাস্টার কিনে পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিলাম। এরপর সে হোটেলে ফিরে গেল—আর আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যার বাকিটা সময় কাটালাম নানা দোকানে ঘুরে ঘুরে, হালকা কেনাকাটা আর গল্পে। বুঝলাম, ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য শুধু দর্শনীয় স্থান নয়—ছোট ছোট এই স্মৃতি, পরিচয় আর মুহূর্তগুলোই আসল সম্পদ। সকালের নাশতা ছিল কফি, ব্রেড আর বাটার। এরপর আমরা তিনজন বেরিয়ে পড়লাম হাঁটতে। হাঁটার পথে রাস্তার পাশে একের পর এক দোকানপাট চোখে পড়লো—কিছু পছন্দ হলে সঙ্গে সঙ্গে কিনে নেওয়া হলো। শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট ছোট খাল। আশ্চর্যের বিষয়, এসব খালেই ফেরি চলছে—কী দারুণ দৃশ্য! খালগুলো গভীর এবং পরিষ্কার বলেই এমন পরিবহন ব্যবস্থা সম্ভব হয়েছে। ভাবতে ভালো লাগে, যদি খালগুলো গভীর না হতো, তবে এত চমৎকার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না। আমাদের দেশেও খাল আছে, ফেরিও আছে, কিন্তু বেশিরভাগ খালেই পানির অভাব। তাই সেখানে ফেরি চলাচল করা তো দূরের কথা, খালই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। আসলে আমাদের দেশে অনেক কিছুই ঠিকমতো পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এই শহরে যেমন মানুষ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে, তেমনি পানি পথেও নৌকায় যাত্রী পরিবহন হচ্ছে—পরিষ্কার, নিয়মিত এবং কার্যকর। দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। নৌকায় উঠলাম যত্রি পরিপূরণ বুঝলাম এখানে লকাল ট্রান্সপোর্ট ও নৌকার ব্যাবহার সমানে সমান। একটা সময় চলে আসলাম ভাসমান বাজারে যা আমরা সবাই জানি ফ্লোটিং মার্কেটে নামে। এখানে কম মূল্যে অনেক কিছু পাওয়া যায়। ব্যাংককে স্ট্রিট ফুড অনেক জনপ্রিয় আমাদের রুচিসম্মত না হওয়ার কারনে খেতে পারি নাই এটা আমাদের একটা দুঃখ। কুকুর বিড়াল ও মুরগি একই সাথে ফ্রাইড করে ঝুলিয়ে রাখা। ফেরার সময় আর নৌকা পাইনি, তাই টুকটুক ভাড়া করে ফিরে এলাম। বিকেল ও সন্ধ্যা কেটেছে সুকুমভিত ও সই নানার রঙিন আলো ও জীবন্ত পরিবেশে। এরপর রাতেই রওনা হলাম রোমের পথে—কারণ আগামীকাল আমাদের ফিরতি ফ্লাইট। সবকিছু গুছিয়ে নিতে হবে।
এই ভ্রমণ কেবল স্থান পরিদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল অনুভব, মানুষের সঙ্গে সংযোগ, নতুন সংস্কৃতি উপলব্ধি এবং অভিজ্ঞতার এক অনন্য যাত্রা। কখনো হঠাৎ দেখা হওয়া, কখনো সহমর্মিতার ছোট্ট মুহূর্ত কিংবা শহরের পরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিন ছিল নতুন শেখার, উপলব্ধি করার এবং স্মৃতিতে গেঁথে রাখার মতো এক অভিজ্ঞতা। বুঝতে পারলাম, ভ্রমণ কেবলই চোখের দেখার বিষয় নয়—এটি হৃদয়ের অনুভব, আর প্রতিটি পদক্ষেপে জমা হওয়া জীবনের গল্প।
Thanks & Regards
===================
Hassan Mahfuz
LinkedIn:https://www.linkedin.com/in/hasanclymax
Email: hasanclymax@gmail.com









Comments
Post a Comment